“একদিন সকালে ঘুম ভেঙে দেখি আমি লন্ডনস্থ বাংলাদেশ এম্বেসির সামনে দাঁড়িয়ে। অপলক দৃষ্টিতে দূতাবাস ভবনের দিকে তাকিয়ে আছি। তা আমি তাকিয়েই আছি। অনেকক্ষণ। সাডেনলি আমাদের হাইকমিশনার সাহেব আমার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে বেরিয়ে আসলেন। ভাবলাম হি ওয়ান্টেড এ হাগ, সো বুক পেতে দিলাম। কিন্তু না, হি সেইড ‘স‍্যার যা পারেন দ‍্যান, দুইদিন ধরে কিছু খাই নাই।’ খুব মায়া হলো। ভাবলাম তাকে কিছু দিই। পকেটে হাত দিয়ে বুঝলাম ওয়ালেটের পরিবর্তে ভুল করে পাসপোর্ট নিয়ে আসছি। হাইকমিশনার সাহেব বললেন, ‘ঠিক আছে স‍্যার, পাসপোর্টটাই দেন।’ দিয়ে দিলাম।”

উপরের কথাগুলো একাত্তরের বেতার ঘোষক মেজর জিয়াউর রহমানের পলাতক জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের। তার কথা শুনে আমরা জানতে পারলাম তিনি আসলে নাগরিকত্ব বর্জন করেননি, মানব হিতৈষী কাজে তার পাসপোর্ট দান করেছেন। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে নির্বাসনে থেকেও দেশের মানুষের জন‍্য তার দয়া, মায়া, মমতা ব‍্যানার্জি একটুও কমেনি। একজন অসহায় ক্ষুধার্ত দেশি ভাইকে তিনি তার প্রিয় পাসপোর্ট খেতে দিয়েছেন। অসাধারণ!

“না না, আপনি ভুল বুঝছেন, আমি আসলে পাসপোর্ট দান করিনি। এর পেছনে অন‍্য কোন কারণ আছে। সেদিন বাসায় ফেরার পর অনেক চিন্তা করলাম। কেন আমি আমার পাসপোর্ট এম্বেসেডরকে দিয়ে এসেছি? ভেবে কূলকিনারা না পেয়ে রবি’র কল সেন্টারে ফোন দিই। তারা আমাকে ৪.৫ জি’র ভূবনে স্বাগত জানায়। তারপর সমস‍্যার কথা বললে তারা জানায় আমি প্রতিবাদস্বরূপ পাসপোর্ট বর্জন করেছি।”

“এরপর সবকিছু দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে যায়। চিন্তা করে দেখলাম দেশের শিক্ষাব‍্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। একজন এক্স নাস্তিক মন্ত্রীকে দিয়ে আমাদের শিক্ষাব‍্যবস্থাকে ধর্মীয়করণ করা হয়েছে। এটা মেনে নেয়া যায় না।”

বুঝেছি, আপনি আসলে শিক্ষা ব‍্যবস্থা ধ্বংসের প্রতিবাদস্বরূপ নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন। দেশের কেউ এমন অতি প্রয়োজনীয় বিষয়ে প্রতিবাদ করেনি। অথচ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও আপনি রুখে দাঁড়ানোর গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন। এজন‍্যই আপনি তরুণ প্রজন্মের অহংকার। এজন‍্যই আপনি বাংলাদেশের ভবিষ‍্যত দিশারী। এজন‍্যই আপনি…

“আসলে ব‍্যাপারটা তা নয়। পরক্ষণে মনে হলো বাংলাদেশের জন‍্য শিক্ষা এত গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। তার প্রমাণ আমাদের পরিবার। শিক্ষা ছাড়াই আমরা একটা দেশ চালিয়েছি। এখন যারা চালাচ্ছে তাদের হয়তো অনেক ডিগ্রী আছে, কিন্তু শিক্ষা কতটুকু আছে, আপনিই দেখুন। আমাদের আর তাদের মাঝে কোন পার্থক‍্য খুঁজে পান?”

তাহলে আপনি কিসের জন‍্য পাসপোর্ট দিয়ে এসেছেন?

“ধর্ষণ! দেশে ধর্ষণের যে মহামারি লেগেছে, তার লাগাম টানতে সরকার ব‍্যর্থ হয়েছে। একজন পুরুষ হিসেবে ধর্ষণ আমাকে অপরাধী করে দেয়। আমি এসব সইতে পারি না। এই অপমান, এই লজ্জা আমি আর নিতে পারছি না। কারণ পুরুষে ধর্ষণ করে, আমিও একজন পুরুষ।”

ওয়াও! আপনি লন্ডনে বসে ধর্ষণের প্রতিবাদ করেছেন! কী অভাবনীয়! কী মহিমান্বিত! পেট্টোলবোমা পরবর্তী যুগে…

“নো, ম‍্যান! পরে আমি নিজের ভুল বুঝতে পারি। যে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখনো একাত্তরে পাক বাহিনীর ধর্ষণের কাহিনী বেচে খায়, জনগণও খাওয়ায়, সে দেশে ধর্ষণ কোন বড় ঘটনা নয়। এমনকি রাজাকারদের সাথে জোট বাঁধা বিএনপিও সুযোগ পেলে খুব কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে একাত্তরে সম্ভ্রম হারানো আড়াই লক্ষ মা বোনের…”

এত না পেঁচিয়ে যদি একটু দ্রুত বলতেন, কেন আপনি পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিলেন?

“আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য প্রতিবাদী হয়েছি
ছোট ঘাসফুলের জন্যে
একটি ঝলোমলো হাওয়া ভবনের জন্যে
আমি হয়তো প্রতিবাদী হয়েছি বৈশাখের ঝড়ো বাতাসে
হেলে পড়া একটি খাম্বার জন্যে
টেন পার্সেন্ট বৃষ্টির জন্যে…
– হুমায়ুন আজাদের এই কবিতাটি পড়েছেন কখনো? অসাধারণ না? যাহোক, মির্জা ফখরুল আমাকে প্রতিদিন ফোন দেয়। বলে ভালো দেখে একটা কারণ খুঁজুন, নাগরিকত্ব বর্জনের একটা উপযুক্ত যুক্তি খুঁজুন, যেন আমরা আবার জ্বালাও পোড়াও শুরু করতে পারি। কিন্তু আমি কোন কারণ খুঁজে পাই না। কিসের ঘোরে সেদিন দূতাবাসের সামনে গেলাম, কেনই বা পাসপোর্ট দিয়ে আসলাম, কোন কিছুই মনে পড়ছে না।”

তার মানে আপনি আসলে কোন কারণ ছাড়াই পাসপোর্ট জমা দিয়ে এসেছেন?

“অবশ‍্যই না। পরে কারণ খুঁজে পেয়েছি। পাসপোর্ট দিয়ে আসার সত‍্যিকারের কারণ খুঁজে পেয়েছি।”

কী সেটা?

“প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের প্রতিবাদে নাগরিকত্ব বর্জন করেছি।”

কিন্তু আপনিতো আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন!

“ছিলাম। কিন্তু যখন ছাত্রলীগ বললো তারা আগে ছাত্র পরে লীগ, তখন আর পক্ষে থাকা যায়নি। যখন ছাত্রলীগ বলেছে তারা শুরু থেকে আন্দোলনের সাথে ছিলো, তখন আর চুপ করে থাকা যায়নি।”

আপনি এখন কোটা সংস্কার বা বাতিলের বিপক্ষে?!

“অবশ‍্যই! দেখুন, এটা একটা জাতীয় লজ্জা। তিনি আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবার প্রতি প্রতিহিংসা বশতঃ কোটা বাতিল করছেন। এটা কোন সুস্থ রাজনীতি হতে পারে না। মামলা হামলার ভয় দেখিয়েও শহীদ জিয়ার আদর্শ হত‍্যা করতে না পেরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। সব সুযোগ হারিয়ে আমি যখন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি, ঠিক তখনই ছাত্রলীগকে দিয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন করালেন। সাধারণ ছাত্রদের দিয়ে তাদেরকে ধাওয়া দিলেন, পেটালেন, জুতার মালা গলায় পরালেন। তারপর তাদের দাবি মেনে নিলেন। তিনি আমার ক্ষমতায় আসার পথ রুদ্ধ করে দিলেন।”

সো স‍্যাড! আর কখনো ক্ষমতায় আসতে পারবেন না, এই কারণে নাগরিকত্ব বর্জন করলেন!!

“ফাক ইউ ম‍্যান! এজন‍্যই আমি বাংলাদেশের সাংবাদিকদের পছন্দ করি না। আপনাকে এত বড় সারিয়ালিস্ট স্টোরি শুনালাম, স্টোরিতে কতগুলো টুইস্ট দিলাম, এতক্ষণ ধরে ত‍্যানা পেঁচাইলাম, এরপরও আপনি বুঝতে পারলেন না দুঃখটা ঠিক কোথায়!”

কোথায় ভাইয়া?

“পার্টির লোকজন চাঁদা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ডোনাররা সবাই আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছে। তাদেরকে বললাম এবারের ঈদের পর নির্বাচন হবে। আমরা ক্ষমতায় আসবো। এটা শুনে মারতে এসেছে। একটা টাকাও দেয়নি।”

ইয়ে মানে…, ঠিক আছে তাহলে। আমাদেরকে সময় দেয়ার জন‍্য অনেক ধন‍্যবাদ।

“আপনাকেও ধন‍্যবাদ। …যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলি? অল্প কয়টা টাকা হবে? দুইদিন ধরে কিছু খাইনি।”

স‍্যরি ভাইয়া, আমি ভুল করে ওয়ালেটটা বাসায় রেখে এসেছি।

Facebook Comments

কিছু বলুন

দয়া করে মন্তব‍্য করুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.