রাজতন্ত্র, সেনাতন্ত্র, কেয়ারটেকারতন্ত্র, গণতন্ত্রসহ কোন তন্ত্রই আন্দোলন পছন্দ করে না। দে হেইট আন্দোলন। কারণ জনগণ বুঝে না বুঝে আন্দোলন করে। এই আন্দোলন একটি জাতির জন‍্য অভিশাপস্বরূপ। একটি জাতি যেতে চায় যাত্রাবাড়ির দিকে, কিন্তু একটি আন্দোলন জাতিকে নিয়ে যায় গাবতলীর দিকে। আন্দোলনের বাড়ি ফার্মগেটে, এখন সে কোন দিকে যাবে? এই যে একটা ডিলেমা, এই ডিলেমার কারণে জাতি বেঁটে হয়ে যায়, কালো হয়ে যায়। জাতির বিয়ে হয় না। ফলে মা মাটি ও দেশের অনেক বড় সমস‍্যা হয়ে যায়। এই সমস‍্যা থেকে উত্তরিত হয়ে দক্ষিণে যেতে হবে। দক্ষিণে সাগর। কিন্তু আন্দোলন সংগ্রামকে যদি একটা নিয়মনীতির আওতায় আনতে না পারি, তাহলে সারা জীবন উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁপিয়ে যেতে হবে, কখনোই উন্নয়নের মহাসাগরে ডুবে মরতে পারবো না।

তাই আন্দোলনকারীদের জন‍্য সরকারি দিক নির্দেশনা প্রণয়ন করা জরুরী হয়ে পড়েছে। কারণ, সরকারসম্মত আন্দোলন সংগ্রাম ছাড়া গরিব দুঃখী মেহনতি মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

কিভাবে একটি সরকারসম্মত আন্দোলন করতে হবে, জেনে নিন –

1

ফেসবুকে লাইক কমেন্ট শেয়ার দিয়ে সরকারপন্থী এক্টিভিস্টদের পাশে থাকুন

আন্দোলন শুরুর আগে সম্ভাব‍্য নেতারা কমপক্ষে ১ মাস ফেসবুকে সরকারপন্থী এক্টিভিস্টদের ফলো করতে হবে, পোস্টে লাইক দিতে হবে, কমেন্ট ও শেয়ার করে ছড়িয়ে দিতে হবে। হাতে তেল মেখে তাদের সাথে চ‍্যাট করতে হবে। বলতে হবে “আমি ফেসবুকে অনেককেই ফলো করি। কিন্তু কারো পোস্ট পড়ে হৃদয়ের গহীনে জমাট বাঁধা হাজার বছরের নিকষ কালো অন্ধকার প্রাচীরে সত‍্য ও সুন্দরের তীব্র কুঠারাঘাত হয় না, কেবল আপনার পোস্ট পড়লে হয়। আমি কি আপনাকে স‍্যার/ম‍্যাম বলতে পারি?” মেসেজের উত্তর পেলে প্রত্যুত্তরে বলতে হবে “ওএমজি! আমি স্বপ্নেও ভাবিনি আপনি মেসেজের রিপ্লাই দিবেন!! আপনার প্রতি সম্মান আরো বেড়ে গেলো স‍্যার/ম‍্যাম।” এভাবে সাবধানী পায়ে এগিয়ে যেতে হবে। খেয়াল রাখবেন তেলের পরিমান যেন সহনীয় মাত্রায় থাকে, না হয় পিচ্ছিল পথে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

2

সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত হতে হবে

সরকারপন্থী ফেসবুকারদের পোস্টে লাইক কমেন্ট শেয়ারের কাজ চলতে থাকবে। পাশাপাশি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিবে এমন কয়েকজন গিয়ে সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠনের ফরম পূরণ করবেন। মানে যুক্ত হবেন। এই যুক্ত হওয়া অত‍্যন্ত জরুরী। তার চেয়ে জরুরী বিষয় হলো আন্দোলনের সম্ভাব‍্য নেতাদের মাঝে যারা স্বাধীনতাবিরোধী তারা যেন সরকারি ছাত্রনেতাকে তথ‍্যটা জানান। আন্দোলন শুরুর আগে জানিয়ে দেয়া নিরাপদ। আগে জানালে ফুল দিয়ে বরণ করে নিবে আর পরে জানলে মাইর দিবে। সুতরাং ফরম পূরণের কাজ আগে সেরে ফেলতে হবে। মাইরের চেয়ে নিশ্চয় ফুল বেটার। যদি সম্ভব হয়, বড় কোন নেতার কাছে গিয়ে ফরম পূরণ করবেন। যাওয়ার সময় উপরের ছবিতে নেতার হাতে যা দেখা যাচ্ছে (উপহার), তা নিয়ে যাবেন।

3

রাজ পন্ডিতদের সম্মতিপত্র যোগাড় করতে হবে

যত বড় জ্ঞানীই হোন, আপনার জ্ঞান যদি সরকারপন্থী না হয় তাহলে এই জ্ঞানের দুই পয়সার মূল‍্য নাই। জ্ঞান গরিমা নিয়ে রিস্কে যাওয়া ঠিক না। আন্দোলনের লক্ষ‍্য, উদ্দেশ‍্য, ইশতেহার, বক্তৃতা বিবৃতি সব সরকারপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একবার দেখিয়ে নিতে হবে। সাথে করে সরকারি ফেসবুকারদের পোস্টে লাইক কমেন্ট শেয়ারের স্ক্রীনশট, সরকারি ছাত্র সংগঠনের সদস‍্য ফরমের ফটোকপিও নিয়ে যাবেন। না হয় পন্ডিতবৃন্দ সম্মতিপত্র দিবেন না। মৌখিক স্বীকৃতিতে ঝুঁকি থেকে যায়, তাই লিখিত অনুমতি নিতে হবে। সিল চপ্পর ও সাইনসহ। সম্মতিপত্র বুঝে নেয়ার সময় একটা ছবি তুলতে যেন ভুল না হয়।

4

যিনি নারীদের সাথে ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তার সাথে ছবি তুলতে হবে

এটা হওয়ার কথা ছিলো প্রথম ধাপ। কিন্তু স‍্যারের হাতে অনেক কাজ। তিনি সবসময় তার স্যুট, ফোন ও সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠনের মডেল পরিবর্তনে ব‍্যস্ত থাকেন, এখনো আছেন। আন্দোলনকারীদের মধ‍্যে নারী সদস‍্যের একটি দল তার কাছে যেতে হবে, গিয়ে উনাকে মাঝখানে রেখে সবাই মিলে কিছু ছবি তুলতে হবে। এটাই নিয়ম, এভাবেই হয়।

5

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমতি নিতে হবে

সরকারি ফেসবুকারদের পোস্টে লাইক কমেন্ট শেয়ারের স্ক্রীনশট, সরকারি ছাত্র সংগঠনের সদস‍্য ফরমের ফটোকপি, রাজ পন্ডিতদের সম্মতিপত্র ও তাদের সঙ্গে তোলা ছবির সত‍্যায়িত কপিসহ পুলিশের কাছে যেতে হবে। অনেকেই পুলিশের কাছে যাওয়ার সময় ফুল নিয়ে যায়। এটা বেয়াদবি। পুলিশ ফুল দিয়ে কী করবে? যাওয়ার সময় উপরের ছবিতে মাঝখানের পুলিশ অফিসারের হাতে হলুদ রঙের যা দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে যাবেন। এটা হস্তান্তরের সময় ছবি তুলে রাখবেন। ভিডিও হলে বেশি ভালো হয়।

6

বক্তব‍্য, বিবৃতি, স্লোগান, ব‍্যানার, ফেস্টুনের মেডিকেল টেস্ট করাতে হবে

পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের পরের ধাপ মেডিকেল টেস্ট। এটা যেকোন সরকারি বেসরকারি ল‍্যাবে করিয়ে নিলেই হবে। মেডিকেল টেস্ট করতে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যাবেন। অনেকেই সাথে করে শুধু পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে যায়, কিন্তু পুলিশকে দেয়া উপহারসহ তোলা ছবি নিতে ভুলে যায়। এটা ঠিক নয়। সরকারি কাজে স্বচ্ছতা হচ্ছে প্রথম শর্ত।

7

BSTI এর অনুমোদন

শুরু থেকে এই পর্যন্ত যত কাগজপত্র পেয়েছেন, সব একত্র করে স্থানীয় মাঝারিমানের সরকারপন্থী নেতা কর্তৃক সত‍্যায়িত করুন। ল‍্যাব টেস্টের রিপোর্টসহ সবকিছু একটা বড় ফাইল ফোল্ডারে নিন। তারপর সোজা নিকটস্থ BSTI অথবা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে যান। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, BSTI এর মেশিনপাতি অনেক সময় ঠিক থাকে না, এজন‍্য বুদ্ধিমানরা ল‍্যাব রিপোর্ট সাথে করে নিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে BSTI কে তার নষ্ট যন্ত্রপাতি ঠিক করতে হয় না।

8

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র

এক জায়গায় অনেকগুলো মানুষ একত্র হলে প্রচুর কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসৃত হয় এবং ওই এলাকার জন‍্য বরাদ্দকৃত সব অক্সিজেন তারা টেনে নেয়। কিন্তু এটা কোন সমস‍্যা না। সমস‍্যা হচ্ছে অন‍্য জায়গায়। লিখিত বক্তব‍্য বিবৃতির কালি, ব‍্যানার ফেস্টুনের রং এবং আন্দোলনকারীদের বিক্ষুব্ধ চোখের রেডিয়েশনে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এজন‍্য পরিবেশ অধিদপ্তরের দিক নির্দেশনা বুঝে নিতে হবে। সাদা কাগজে সিগনেচার দিয়ে তাদের ছাড়পত্র নিতে হবে। যাওয়ার সময় এর আগে জমানো সব কাগজপত্রের পাশাপাশি ঘরভিটের দলিল ও খাজনার রসিদ নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে দখলদারদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। সরকারি ছাত্র সংগঠনের সদস‍্য হওয়ার পর যদি কোন খাসজমি, খাল, নদী, রাস্তা ইত‍্যাদি দখল করে থাকেন, সাথে করে সেটার প্রমাণ নিয়ে যাবেন। তাহলে দ্রুত কাজ হবে।

9

রাষ্ট্রীয় আধ‍্যাত্মিক মুরুব্বীর দোয়া ছাড়া আন্দোলন হবে না

আসলে এটা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ছবিতে যে ভদ্রলোককে ব্লার করা হয়নি, সেই ভদ্রলোকের কাছে আপনাকে যেতেই হবে। দোয়া নিতে হবে। তিনি আব্বাদের আব্বা, আম্মাদের আম্মা, মুরুব্বীদের মুরুব্বী। তার দোয়া ছাড়া এই দেশের একটা নৌকারও বৈঠা নড়ে না, একটা ধান গাছেরও শীষ নড়ে না। সুতরাং আন্দোলনের সম্ভাব‍্য নেতাদের একটি দল মুরুব্বীর কাছে গিয়ে নিশ্চিত করতে হবে আন্দোলনে ধর্ম ব‍্যবসায়ী, ভন্ড, যৌন বিকারগ্রস্থদের লেজে কেউ পাড়া দিবে না। তারপর মুরুব্বী তার দোয়া সম্বলিত একটি অডিও ফাইল Share It এপসের মাধ‍্যমে প্রতিনিধি দলের মুঠোফোনে ভরে দিবেন। এখানে একটা কথা বলে রাখি; অনেকে মনে করেন ওই মুরুব্বী তার মত ঘনজঙ্গল ইন্টারফেস পছন্দ করেন। আসলে তা নয়। প্রতিনিধি দলের সবাইকে ক্লিনশেভড হতে হবে। ভয়ের কোন কারণ নেই এটা পেইনলেস ও হার্মলেস। মুরুব্বী শুধু চোরাচোখে দেখবেন, অন‍্য কিছু না।

10

উপাচার্যের সংহতি অর্জন

এই কাজটা আরো আগেও করা যেত। কিন্তু করা যায়নি। কারণ প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর চেয়ারের পর এই চেয়ারটা বড্ড বেয়াহা ও লোভনীয়। এই চেয়ারে যিনি বসেন, তিনি আর উঠতে চান না। তার নিজের কোন কাজ নেই, কথা নেই, আলাপ নেই। অন‍্যরা (সরকারি লোকজন) যা করেন, যা বলেন তিনিও তাই করেন, তাই বলেন। সুতরাং তিনি আগে দেখবেন সরকারি ফেসবুকার, ছাত্রনেতা, পন্ডিত, প্রভাবশালী নেতা, পুলিশ, জাতীয় মুরুব্বিরা কী বলেছেন। ইনারা যা বলেছেন, উপাচার্য মহোদয়ও তা বলবেন। তাই উপাচার্যের মতামত নিয়ে টেনশনের কিছু নেই। পূর্বের ধাপগুলো ঠিকমত পালন করতে পারলে উপাচার্যেরটাও হয়ে যাবে। অবশ‍্য এই ধাপটি শুধুমাত্র বিশ্ববিদ‍্যালয় এলাকার ক্ষেত্রে প্রযোজ‍্য।

11

এবার আন্দোলনটা করতে হবে

অবশেষে আন্দোলন শুরু করা যাচ্ছে। কিন্তু তার আগে একবার ভাবুনতো, আন্দোলনটা কোথায় করবেন? রাজপথে? এটা বড্ড অমানবিক চিন্তা। একটি সভ‍্য সমাজে রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করার কথা চিন্তাও করা যায় না। তাছাড়া রাস্তায় আন্দোলন করবে রাস্তার ছেলেরা। শিক্ষিত লোকজন কিভাবে রাস্তায় আন্দোলন করে? ছিহ!! পিচঢালা রাস্তা, প্রস্রাবের রাস্তা, পায়খানার রাস্তাসহ সব রাস্তা উন্মুক্ত রাখতে হবে। যাতায়াতের জন‍্য এটা অত‍্যন্ত জরুরী বিষয়। আন্দোলন করতে হবে শহরের বাইরে, লোকালয়ের বাইরে। যদি সম্ভব হয়, দেশের বাইরে। বেড়ানো হলো, আবার আন্দোলনও হলো। নিরপেক্ষ প্রতিবেশী দেশ, যেমন ভুটান অথবা নেপালে করা যেতে পারে। হিমালয়ের হিম শীতল কার্বনমুক্ত অত‍্যন্ত সুন্দর ও স্বাস্থ‍্যকর পরিবেশে আন্দোলন হলে সবারই লাভ। তবে আন্দোলনকারীদের যদি টাকা পয়সা বেশি থাকে, তাহলে ইউরোপই বেটার! আধুনিক সভ‍্যতা ও অপার্থিব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশে গিয়ে আন্দোলন করলে আন্দোলনের লেভেল অনেক উপরে ওঠে। আর ওখানে গিয়ে রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করলে বাংলাদেশের উন্নয়নে কোন বাধার সৃষ্টি হবে না। উন্নয়ন ইজ রিয়াল, বাকি সব এতলেতিকো।

12

আন্দোলনের সমাপ্তি অনুষ্ঠান

আন্দোলন সফল হয়েছে নাকি ব‍্যর্থ হয়েছে, সেটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের চিন্তা না করলেও চলবে। আন্দোলনের স্বার্থকতা বিচার হবে সরকারি মানদন্ডে। আন্দোলন কতটুকু সরকারসম্মত হয়েছে, সেটাই মূল বিবেচ‍্য বিষয়। এটা ঠিক যে, মানুষের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। তাছাড়া মানুষ মাত্রই ভুল করে। সুতরাং আন্দোলনে ভুলভ্রান্তি হতেই পারে। কিন্তু সেটা মেকআপ দেয়া সম্ভব। আন্দোলন শেষে প্রধানমন্ত্রীকে তার প্রাপ‍্য বুঝিয়ে দিতে হবে। তিনি মাদার অব কী হলেন, তার ঘোষনা দিতে হবে। একাধিক খেতাব কাম‍্য। তবে একাধিক খেতাব দেয়া সম্ভব না হলে অন্তত একটি খেতাব হলেও দিতে হবে। এবং অবশ‍্যই খেতাবের শুরু হতে হবে “মাদার অব” দিয়ে। যেমন মাদার অব হিউম‍্যানিটি অথবা মাদার অব ডেমোক্রেসি। খেতাব যত ভারী হবে, আন্দোলন ততটা সরকারসম্মত হবে। কথা এটাই! আপনি আগে কী কী করছেন না করছেন, সেটা আপনার ব‍্যাপার। কিন্তু এই ধাপটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ব‍্যাপার। আন্দোলন যার যার, খেতাব প্রধানমন্ত্রীর। বিষয়টা মনে রাখতে হবে।

Facebook Comments

কিছু বলুন

দয়া করে মন্তব‍্য করুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.